স্মৃতির পাতায়  আল- আমিন একাডেমি

0
ছবিঃ নিজস্ব

হিফজুর রহমান

পর্ব :: ১

এই তো সেদিনের কথা, বদরপুর গিফট কর্ণারে ফয়জুর ভাইয়ের দোকানে আমরা সন্ধ্যায় আড্ডা জমাতাম। এ আড্ডায় প্রায়ই অংশ নিতেন বেলাল ভাই। যদিও সেদিন  মনে হচ্ছে, আসলেে সে দিন বলতে ২৬/২৭ বছর আগের অর্থাৎ ১৯৯৩ সালের দিন গুলোর কথা বলা হচ্ছে। পৃথিবীতে অনেক আড্ডা থেকে জন্ম নিয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠান, অনেক বিপ্লব, অনেক আন্দোলন। এভাবেই এ আড্ডা থেকে একদিন বেরিয়ে এলো বদরপুরে ইসলামি মূল্যবোধ সম্পন্ন একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল প্রতিষ্ঠার চিন্তা ভাবনা। ধীরে ধীরে এ চিন্তা ভাবনা প্রকট হতে লাগলো। তারপর সত্যি সত্যিই একদিন আল- আমিন একাডেমি নামের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাস্তবের রূপ নিলো। আর আজতো আল আমিন একটা মহীরুহের নাম। শেষ পর্যন্ত এ এক প্রতিষ্ঠান হিসেবে থাকল না, কার্যতঃ বরাকের শিক্ষাজগতে এ এক বিপ্লবের রূপ পরিগ্রহ করল। সমাজ পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত বদরপুর আল আমিন একাডেমির অনেক ছাত্র আজ দেশের নামি দামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, আই আই টি, আই আই এম, নিট ইত্যাদি সহ বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে পড়াশুনা করে চলেছে। গত ক’বছর থেকে বেশ কিছু প্রাক্তন ছাত্র দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরকারিও বেসরকারি
খণ্ডে বিভিন্ন সম্মান জনক পদে নিযুক্তি পেয়ে দেশ তথা জনগণের সেবা করে আসছে।

প্রারম্ভিক কালে এ প্রতিষ্ঠানকে অনেক কাঠ খড় পোহাতে হয়েছে। তিল তিল করে গড়ে উঠেছে এ প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন সময়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিরও সম্মুখীন হতে হয়েছে আল আমিন একাডেমিকে। নতুন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে যদিও এটা বড়ো কোনো ঘটনা নয়। তবে আল- আমিন পরিবারের অটুট টিম স্পিরিটের সামনে সে প্রতিকূল অবস্থা কার্যত পরাজিত হতে বাধ্য হয়। এক মিশন ও ভিশনকে সম্মুখে রেখে এর সূচনা হয়েছিল- এটাকে লালন করেই নিয়ে এগিয়ে চলছে আল আমিন একাডেমি। যদিও এখনো অনেক কাজ বাকি- গন্তব্য অনেক দূর।

পর্ব:: ২

সম্ভবত 1993 এর জুন মাস। ফয়জুর ভাই ও আমি গুয়াহাটিতে এসআইও-র দু’দিবসীয় মিটিংএ গেলাম। আগে থেকে মুজাহিদ পত্রিকা মারফত জানতে পারি যে বরপেটার হাউলিতে মাওলানা মইনুল হক ইসলামি মূল্যবোধ সম্পন্ন একটা ইংরেজি মাধ্যম স্কুল স্থাপন করেছেন দুই তিন বছর আগে। মিটিং শেষ হলে আমরা ওই স্কুল পরিদর্শন করতে গেলাম। গুয়াহাটি থেকে হাউলি পৌঁছতে প্রায় চার ঘণ্টা লেগে গেল। আসরের ঠিক পর পরই হোমায় গিয়ে পৌঁছলাম। তখন স্কুল চত্বরে ছাত্ররা খেলাধুলা করছিল। খেলার ফাঁকে আমাদের দেখে দৌড়ে এসে আমাদের অভ্যর্থনা জানাল। তাদের এ আন্তরিকতা দেখে আমরা অভিভূত হয়ে গেলাম। পাশাপাশি স্কুলের পরিবেশ আমাদের সমানভাবে আকৃষ্ট করলো।

রাতের বেলা ছাত্রদের হোম স্টাডি পরিদর্শন করলাম। তাদের সাথে কথাবার্তা হলো। তাদের অমায়িক ব্যবহার ও ইংরেজি কথাবার্তা আমাদের মুগ্ধ করল। নামাজ ও খাওয়া দাওয়ার পর তাদের ঘুমানোর নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলা দেখে ততোধিক মুগ্ধ  হলাম। খাওয়া দাওয়া সহ  কচিকাঁচাদের ঘুম পাড়ানোর মতো মাতৃসদৃস পরিচর্যা সাধারণ কথা নয়। সারা রাত ব্যাপী আব্দুল আজিজ ভাইয়ের আন্তরিক সেবা ও ত্যাগ দেখে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অনেক গুণ বেড়ে গেল। পরের দিন আমাদের প্রতি কচিকাঁচাদের সেবা ও যত্ন দেখে আপ্লুত হলাম। কে টিউব ওয়েল থেকে বালতিতে জল ভরে দেবে, কে সাবান এনে দেবে, কে চপ্পল এনে দেবে- সে নিয়ে তাদের প্রতিযোগিতা দেখে অভিভূত না হয়ে পারলাম না। এসব দেখে তখনই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম যে বদরপুরে গিয়ে আগের চিন্তা ভাবনাকে গতি দিতে হবে, যেমন করেই হোক একটা স্কুল স্থাপনের কাজ শুরু করতে হবে।

পর্ব :: ৩

হোমা পরিদর্শন করে এলাম। আমরা তিনজন- ফয়জুর ভাই, বেলাল ভাই ও আমি ফের গিফট কর্ণারে মিলিত হলাম। প্রস্তাবিত স্কুল নিয়ে এক প্রস্থ আলোচনা সেরে নিলাম। আমাকে আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হলো। আমি আমার বাড়ির বৈঠকখানায় ( টঙ্গী ঘরে) এক সভার আহবান করলাম। ডাকলাম সমমনোভাবাপন্ন আরো কয়েকজনকে। উপস্থিত হলেন জানাব মহবুবুর রহমান, খালিদ আহমেদ, সাহাব উদ্দিন ও ডাঃ লুতফুর রহমান। এভাবে তিন- চারটা বৈঠক হলো। সিদ্ধান্ত হলো, প্রস্তাবিত ইসলামি মূল্যবোধ সম্পন্ন স্কুলটির কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটিতে উল্লেখিত সকলকে নেওয়া হলো।এই কমিটির পক্ষ থেকে এধরনের স্কুল স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার ওপর একটা প্রচার পত্র প্রকাশ করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হলো। কারণ এধরনের স্কুলের ধারণা তখনকার বদরপুর এলাকায় একদম নতুন। এই প্রচারপত্র লেখার দায়িত্বও আমার উপর অর্পিত হলো। অক্টোবর মাস নাগাদ তা প্রকাশিত ও প্রচারিত হলো। এতে মোটামুটি সাড়া পেলাম। এবারে স্কুলের নাম কী হবে সে নিয়ে সভায় একেক জন একেক নাম উপস্থাপন করলেন। আমি আল- আমিন একাডেমি, বদরপুর নাম দিলাম। সৌভাগ্যক্রমে এই নামটিই সর্বসম্মত ভাবে গৃহীত হলো। ভর্তির জন্য পোস্টারিং করা হলো। নভেম্বর থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্র ভর্তির জন্য তৎপর হলাম। এতে আমাদের সাথে প্রায়ই অংশগ্রহণ করতেন বয়ঃজ্যেষ্ঠ জানাব মইনূল হক চৌধুরি ও জানাব মহবুবুর রহমান। এভাবে ভর্তি প্রক্রিয়া জানুয়ারি অব্দি চললো। চৌত্রিশ জন ছাত্র নিয়ে ফেব্রুয়ারিতে স্কুলের উদ্বোধন হল। স্কুল পরিচালনায় সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনের বাইরে আমাকে অবৈতনিক অধ্যক্ষ, বেলাল ভাইকে সম্পাদক ও ফয়জুর ভাইকে কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করতে হলো। সবক’টা পদই ছিল ভাতা মুক্ত। এভাবে ১৯৯৮ পর্যন্ত অবৈতনিক অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করলাম। ১৯৯৯-এ আমার উপর সম্পাদকের দায়িত্ব অর্পিত হলো। ২০০০ সালে হোস্টেল আরম্ভ হলে বেলাল ভাই ও ফয়জুর ভাই এর উপর পর্যায়ক্রমে হোস্টেল এর দায়িত্ব অর্পিত হলো।  আমাদের কাছে পদের গুরুত্ব মোটেই ছিল না, ছিল কাজের গুরুত্ব। যদিও একেক জনকে একেক দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে খুব একটা ভিন্নতা ছিল না।পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস ও সহযোগিতা ছিল প্রকট। একটাই স্বপ্ন ছিল কীভাবে স্কুলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। ১৯৯৪ সাল থেকে বেলাল ভাইকে স্কুলের জন্য বদরপুরে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতে হলো।

ক্রমশঃ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here